কালের সাক্ষী লাট সাহেবের লিচুবাগান - BSP TV 24

শিরোনাম

কালের সাক্ষী লাট সাহেবের লিচুবাগান

দূর থেকে দেখে মনে হয় শস্যখেতের মাঝে এক টুকরা অরণ্য জমাটবদ্ধ হয়ে আছে। কাছে যেতেই গোড়া দেখে লিচুগাছগুলোর বয়স সম্পর্কে একটা ধারণা মেলে। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতবর্ষী এসব গাছ। সবুজ ঘন পাতায় আচ্ছাদিত গাছগুলোয় প্রতি মৌসুমে প্রচুর লিচু ধরে। সুমিষ্ট এসব লিচুর কদর আছে আশপাশের এলাকায়।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা কাথুলী গ্রামের মাঠে অবস্থিত এ লিচুবাগান। আগে অর্ধশত লিচুগাছ থাকলেও কালক্রমে হারিয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি। এখন মাত্র ২৪টি লিচুগাছ রয়েছে, যেগুলোর কোনো পরিচর্যা করা হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে অনেকে ব্যবসা করতে আসতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে এ দেশেই থেকে গেছেন। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী গ্রামে এমন একটি ঘটনার খোঁজ মেলে। ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডের লাট সাহেব শেফার্ড ফিল্ড তাঁর স্ত্রী সোফিয়া ফিল্ডকে নিয়ে এখানে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। পোড়া ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে একতলা বাড়ি নির্মাণ করেন লাট সাহেব। বাড়ির চারদিকে রোপণ করেন ৫০টি লিচুগাছ। লিচুবাগানের পাশেই খনন করা হয় শানবাঁধানো বিরাট একটি পুকুর।

সম্প্রতি লাট সাহেবের লিচুবাগান দেখতে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে নব্বই-ঊর্ধ্ব ফজের মণ্ডল বলেন, ‘লাট সাহেবের লিচুবাগান জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার সময় থেকে দেখে আসছি। ছোটবেলায় লিচু পাকার মৌসুমে বাগানের নিচে নানা রকম খেলাধুলা হতো। গাছ থেকে পড়া পাকা লিচু আগে কে কুড়াবে, চলত সেই প্রতিযোগিতা। লাট সাহেবের স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি ভারত থেকে চলে যান। পরে বাগানবাড়িটি হাতবদল হয়ে সাধক শ্রী নিগমানন্দের হাতে আসে। তিনি সেখানে নিগমানন্দ সরস্বতী বিদ্যামন্দির নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। স্কুলটি শহরে স্থানান্তরের পর এলাকার মানুষ স্থাপনা ভেঙে ইটগুলো ছাড়িয়ে নেয়। এখন লিচুবাগানের গাছের মধ্যে ২৪টি বেঁচে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।’

লিচুবাগানের আশপাশের জমিতে ফুলকপি ও মরিচের আবাদ করেছেন এলাকার কয়েকজন কৃষক। এমন এক কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জন্ম থেকে দেখছি লিচুগাছগুলো। টসটসে মিষ্টি লিচু নিতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এখানে। তবে পোকার আক্রমণে অনেক গাছের গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সঠিকভাবে পরিচর্যা ও কীটনাশকের ব্যবহার করলে গাছগুলো রক্ষা করা সম্ভব।’

মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আহমেদ বলেন, সাহেবের কুঠিবাড়ি ও বাগান সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় এলাকার মানুষ কুঠিবাড়িটি ধ্বংস করে ফেলে। একেবারে ভারত সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত ছিল অনেক কম। এভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে একটি ইতিহাস বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয় কাথুলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মাহাতাব হোসেন বলেন, লাট সাহেবের লিচুবাগানটি বর্তমানে নজরুল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সম্পত্তি। বছরের শুরুতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ বাগানটি মোটা টাকায় ইজারা দিয়ে দেয়। ইজারা নেওয়া ব্যক্তিরা লিচুর ফুল আসার পর থেকে তাঁবু গেড়ে পাহারা বসান। গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ না করা পর্যন্ত তাঁরা বাগান পাহারায় থাকেন।

কাথুলী ইউপির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘বাগানের বিশালাকৃতির একেকটি গাছে প্রচুর লিচু ধরে। সুমিষ্ট লিচুর জন্য দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় বেশ কয়েকটি লিচুগাছ মারা গেছে। জীবিত গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কখনো কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক স্বপন কুমার খাঁ বলেন, সাহেবের বাগানের লিচুগাছগুলোর পরিচর্যা প্রয়োজন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কৃষি বিভাগের সহযোগিতা চাইলে অবশ্যই গাছগুলো রক্ষায় পরামর্শ ও উদ্যোগ নেওয়া হবে।